মাইন সরকার:-একটি বইয়ের মলাটে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন 'চাঁদনি পসর রাতে যেন আমার মরণ হয় 'গানটির কথা। লেখেছিলেন-- প্রবল জোসনার তোড়ে ভেসে যাওয়া কোনো এক রাতে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। জোসনা তাঁর মধ্য সবসময়ই তুমুল হাহাকার তৈরি করতো। তাঁর শেষ চাঁদ দেখা আমেরিকার আকাশে। কবি গল্পকার ও ঔপন্যাসিক আরিফ মঈনুদ্দীনের লেখা গদ্য সম্পর্কে প্রয়াত জোসনা বিলাসী এই লেখকের একটি মূল্যায়ন তুলে ধরলাম--- সম্প্রতি আরিফ মঈনুদ্দীনের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন। আমার সৌভাগ্য -- তিনি আমাকে তাঁর গল্পগুলো আগেই পড়তে দিয়েছিলেন। আমি আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে পড়েছি। আরিফ মঈনুদ্দীনের গদ্য চমৎকার। কাহিনি তৈরির কলাকৌশলও তিনি ভালো জানেন। লেখকের প্রধান যে গুণ -- চারপাশের মানুষের প্রতি মমতা, তা তাঁর আছে। কাজেই গদ্যের কঠিন ভূমিতে তাঁর পদচারণা সহজ ও স্বাভাবিক হওয়ারই কথা। তাঁকে অভিনন্দন। তাঁর হাতে সোনার ফসল ফলুক এই শুভ কামনা। হুমায়ূন আহমেদের কথার সাথে তাল মিলিয়ে মুগ্ধতায় আমিও বলতে চাই- আরিফ মঈনুদ্দীনের গদ্যের কাহিনি তৈরি এবং বলার ধরন সহজ, সরল, সাবলীল ও মাধুর্যপূর্ণ। তাঁর গদ্যে বাক্য তৈরির যে জাদুময়তা তা প্রকৃত সাহিত্য অনুসন্ধানী পাঠককে খুব সহজে আন্দোলিত করবে এবং টেনে নিয়ে যাবে মুগ্ধতার এক সুদূরতম শুদ্ধতার পথে, তাই আমিও ভাবনার পাল উড়িয়ে একজন মুগ্ধ পাঠককের মতো পঠ করি আরিফ মঈনুদ্দীনে দীর্ঘ রোমান্টিক উপন্যাস "জুরানপুরের গল্প"। "জুরানপুরের গল্প" একটি দীর্ঘ উপন্যাস। জুরানপুর কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার একটি গ্রাম, ছবির মতোই সুন্দর এই গ্রামটি। দেখার জন্য সারা দেশ থেকে লোকজন ছুটে আসে সারা বছরই। তবে জুরানপুরের সৌন্দর্যের কারণেই হয়তো উপন্যাসটির নামকরণ করা হয়েছে "জুরানপুরের গল্প"। উপন্যাসে নায়ক চরিত্রটি হলো শামীম জামান, যে কীনা জন্মপরিচয়হীন। শামীম জামান এক সন্তানহীন পরিবারের সবটুকু ভালোবাসা ও অপরিসীম মায়ামমতায় দিনকে দিন বেড়ে উঠে। প্রচণ্ড মেধাবী এই তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স করেন। পড়াশোনা ফাঁকে এক সতীর্থ মায়াময় সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়েন. আলোচ্য উপন্যাসে মেয়েটির নাম শানজানা। শানজানার সাথে শামীম জামানের এই প্রেম ক্রমশই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার এই পবিত্র প্রণয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার জন্মপরিচয়। তাই শামীম এক পর্যায়ে লেমেন্টেশনের চরম মাত্রায় পৌছেও নির্মম আত্মহননের পথ থেকে বেঁচে উঠেন। ছবির মতো একটি সুন্দর গ্রাম, পুকুর,পাখি, প্রকৃতি এতিমখানার সৌন্দর্য তাকে পুনরায় জীবন দান করে। প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জুরানপুরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আবার নতুন করে সতেজ মন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। বেঁচে থাকার মোহ জেগে উঠে অস্তিত্বের সজাগ ভূমিতে। এই জুরানপুরের সৌন্দর্যের পেছনে যার ভূমিকা অপরিসীম। তিনি হলেন ঐতিহ্যবাহী ভূঁইয়া পরিবারের প্রধান পুরুষ মেজর জেনারেল (আব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া। শামীম জামানকে সব থেকে বেশি বেঁচে থাকতে উৎসাহ যুগিয়েছে এতিমখানা ও মাদরাসার সুন্দর এই পরিবেশ। আমাদের এই যে সমাজ, এই যে এতো কিছু, এতো মানুষ প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষই কিন্তু মানুষ নয়। শামীম জামান এমন এক পরিবারের হাতে পড়েছিলো, যারা তাকে তিল তিল করে পরম স্নেহ মায়া মমতায় লালন পালন করে নিজের সন্তানের মতো একজন পরিপূর্ণ সত্যিকারের মানবিক ও প্রেমিক করে গড়ে তুলেছে। এই উপন্যাসে আসলে তারাই প্রকৃত মানুষ চরিত্র। ঔপন্যাসিক আরিফ মঈনুদ্দীন নায়ক শামীম জামানের যে জীবনের উত্থান পতনের সাবলীল ও মনোমুগ্ধকর চিত্র অংকন করেছেন তা আসলে আমাদের এই সমাজেরই চিরন্তন চিত্র। সাহিত্যিক এখানে তাঁর লেখনি শক্তির মাধ্যমে চরম বেদনাকেও বাগানের মালির মতো পরিচর্যা করে ফুল বাগানে পরিণত করেছেন। যা একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের পক্ষেই এমনটা সম্ভব। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই এমন ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। আরিফ মঈনুদ্দীনের একজন সতীর্থ বন্ধুবর লক্ষ্মীপুর, দাসের হাট গ্রামের লোক গবেষক ফকির মুহব্বত শাহ্ যে কিনা একাধারে কবি, কথক, লেখক, শিক্ষক, সংগঠক, গীতিকার, নাট্যকার, বংশীবাদক ও পরিব্রাজক মানুষ। বাংলাদেশের লোক সাহিত্য - সংস্কৃতি, লোককথা, কিচ্ছা -- কাহিনি, রুপক, লোক সংগীত সংগ্রাহক, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্রগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের গ্রামগুলিতে লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতির খোঁজে কুঁড়েঘর, টং, বেদেবহর, খড়ের গাদা, মেঠোপথ, হাট- ঘাট- বাট, বন বাদাড়, নদী, পাহাড় সমতলে চষে বেড়িয়েছেন।ঔপন্যাসিক আরিফ মঈনুদ্দীনের উপন্যাস প্রসঙ্গে ফকির মুহব্বত শাহ্ বলেন-- "উপন্যাস শ্রব্য বা পাঠ্য, কথাসাহিত্যের অপরাপর শাখার মধ্যে সম্ভবত উপন্যাসের মধ্য দিয়ে একজন লেখক নিজের ভূও দর্শন, অন্তর দর্শন প্রতিফলিত করে থাকেন। গ্রন্থ সংখ্যা দিয়ে একজন লেখককে বিচার করা সমীচীন নয় ঠিকই; তবে সাহিত্যযজ্ঞের সুবিশাল সমুদ্র প্রমান বিস্তারে একজন প্রকৃত লেখককে খুঁজে পেতে হলে তাঁর কর্ম পরিচয়ও বিবেচ্য বিষয়। পেশাগত জীবনে একজন উর্ধ্বতম ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও সময় সমান্তরালে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া, তা-ও কাব্য- কবিতা, গল্প- উপন্যাস সহ সাহিত্যের একাধিক শাখা ও বিষয় নিয়ে চাট্টিখানি কথা নয়। কাব্যগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস নিয়ে তাঁর সৃষ্টি কর্মের সংখ্যা ২২ টির মতো হবে। তাঁর সৃষ্টি সংখ্যা দিয়েও তাঁর সাহিত্য নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও মনীষার পরিচয় পাওয়া যায়। এক জীবনে আটটি উপন্যাস লেখা অতো সহজ ব্যাপার নয়। সাহিত্যের বিশাল বিত্ত বৈভবের মধ্যে,” মহাকাব্যের ” পরেই উপন্যাসের স্থান। উপন্যাস লেখককে একজন কবির মতোই জীবনের ভেতর জীবনে অবগাহন করে তবেই পাড়ি জমাতে হয় এ সাম্রাজ্যে। আরিফ মঈনুদ্দীন জীবনের পাঠ নিয়েই তাঁর দেখা জগৎ জীবনের অন্তর্ভেদী রহস্য উম্মোচনে উদ্যোগি হয়েছেন। আর তাতে তিনি পারঙ্গমতা দেখাতে পেরেছেন। তাঁর প্রকৃত প্রমাণ ” আকাশ ছুয়েছে মন “– উপন্যাসের পরিস্ফুটন। ২০০৯ সালে বইমেলায় — প্রকাশিত উপন্যাসটি ২০১৭ এর মধ্যে ষষ্ঠ মুদ্রণ হয়! আসলে আমরা যারা লেখালেখি করি, তারা মানুষের কাছে যাওয়ার মতো সম্ভার সৃষ্টি বা তৈরি করতে পারি না বলেই পাঠক সাহিত্য বিমুখ – প্রযুক্তি নয়। উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ হলো রম্যময়তা তা আরিফ মঈনুদ্দীনে উপন্যাসে খুঁজে পাই। জুরানপুরের গল্প ৩২৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেন ' বিশ্বসাহিত্য ভবন'। উপন্যাসটির ফোর কালারের প্রচ্ছদ করেন প্রচ্ছদ শিল্পী মাসুম রহমান। উপন্যাসটির প্রথমেই আরিফ মঈনুদ্দীন তাঁর কৈফতে লিখেন --"জুরানপুর নামের মোহেই ছুটে যাওয়া। সুন্দর ছবির মতো একটি গ্রাম। অল্পবিস্তর আধুনিকতার ছোঁয়ায় নান্দনিক হয়ে উঠেছে গ্রামটি। বেশ ক'বছর আগে যখন এই গ্রাম দেখতে যাই তখনই একটি ঘটনা মাথায় আসে। ঘটনার ঘনঘটায় উপন্যাসের নায়ক এসে হাজির হয় এখানেই। তারপর শুধুই এগিয়ে চলা। গল্পের প্রয়োজনে কতিপয় বাস্তব চরিত্রের মুখে কিছু সংলাপ তুলে দিতে হয়েছে। যা একান্তই আমার নিজস্ব ভাবনাপ্রসূত। লেখা:-কবি মাইন সরকার